ডাকসুর যাত্রা: প্রথম বৈঠকেই মতবিরোধ

রবিবার, ২৪ মার্চ ২০১৯ | ১২:০২ অপরাহ্ণ |

ডাকসুর যাত্রা: প্রথম বৈঠকেই মতবিরোধ
পাশে অন্যদের মধ্যে ভিপি নুরুল হক নুর ও জিএস গোলামা রাব্বানী

প্রধানমন্ত্রীকে আজীবন সদস্য করায় আপত্তি ভিপি নুরের বিরোধীদের বিক্ষোভ, মানববন্ধন কালোব্যাজ ধারণসহ লাল কার্ড অভিষেক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতিকে আমন্ত্রণের প্রস্তাব রিকশা-সাইকেল লেন ও ভাড়া নির্ধারণে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তবিরোধীদের বিক্ষোভ, মানববন্ধন, কালোব্যাজ ধারণ এবং লাল কার্ড প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে শনিবার নব নির্বাচিত ডাকসুর প্রথম কার্যকরী সভাতেই ভিপি নুরুল হকের সঙ্গে তীব্র মতবিরোধে জড়িয়েছেন সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া ছাত্রলীগ প্যানেলের সদস্যরা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ডাকসুর আজীবন সদস্যপদ দে অভিষেক অনুষ্ঠানের প্রস্তাব য়ার এক প্রস্তাবের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন নুর। এ ছাড়া নব নির্বাচিতদের জন্য বড় করে একটি গৃহীত হলেও তাতে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতিকে অতিথি করার বিষয়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত আসেনি। তবে ক্যাম্পাসে রিকশা-সাইকেলের জন্য আলাদা লেন এবং রিকশার ভাড়া নির্ধারণ বিষয়ে সবাই একমত হয়েছেন। শনিবার বেলা ১১টায় ডাকসু ভবনের দ্বিতীয় তলার কনফারেন্স রুমে ২৮ বছর ১০ মাস পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের প্রথম কার্যকরী সভা শুরু হয়। যেখানে নির্বাচিত ২৫ সদস্যের নেতৃত্ব দেন ডাকসু সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য অধ্যাপক আক্তারুজ্জামান। সভার শুরুতে সাংবাদিকরা ছবি তুললেও পরে এ সভা হয় রুদ্ধদ্বার কক্ষে। যেখানে প্রথমেই মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদ এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি সলাম এবং সম্মান জানানো হয়। তাদের সম্মানে এক মিনিট নীরবতাও পালিত হয়। তবে ভেতরে যখন এ সভা চলছিল তখন ডাকসু ভবনের ঠিক সামনেই ১১ মার্চের নির্বাচনকে প্রহসন উলেস্নখ করে তা বাতিল ও পুনঃতফসিল চেয়ে মানববন্ধন, কালোব্যাজ ধারণ, নীরব পদযাত্রা, বিক্ষোভ মিছিল ও উপাচার্যসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনকে লাল কার্ড প্রদর্শন করেন বিরোধীরা। শনিবার ডাকসুর প্রথম কার্যকরী সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এর আজীবন সদস্য করার এক প্রস্তাব উত্থাপন করেন ডাকসুর আন্তর্জাতিক সম্পাদক শাহরিমা তানজিনা অর্ণি। পরে উপাচার্য নিজেও প্রস্তাবটি সবার সামনে উপস্থাপন করেন। তবে এ প্রস্তাবে আপত্তি জানান ডাকসুর ভিপি নুরুল হক নুর ও সমাজসেবা সম্পাদক আখতার হোসেন। এই দু’জন ছাড়া ডাকসুর বাকি সদস্যরা এ প্রস্তাবে সমর্থন দেন। প্রস্তাবে আপত্তি জানিয়ে নুরুল হক নুর বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একজন সম্মানিত ব্যক্তি। এই বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে যে ডাকসু, সেখানে তার মতো সম্মানিত ব্যক্তিকে সদস্য করা ঠিক হবে না। তার কথার সঙ্গে একমত প্রকাশ করেন সমাজসেবা সম্পাদক আখতার হোসেনও। এ বিষয়ে সাংবাদিকদের সামনেও বিতর্কে জড়ান ভিপি ও জিএস। ভিপি নুরুল হক যখন সাংবাদিকদের কাছে প্রধানমন্ত্রীকে ডাকসুর আজীবন সদস্য করার প্রস্তাবে তার আপত্তির বিষয়ে জানান তখন জিএস গোলাম রাব্বানী তার কথায় কয়েক বার বাধা দেয়ার চেষ্টা করেন। পরে সাংবাদিকদের অনুরোধে রাব্বানী চুপ করলে নুরুল কথা বলেন। নুরুল হকের বক্তব্য শেষ হলে গোলাম রাব্বানী বলেন, যেখানে অধিকাংশ সদস্য মত দিয়েছেন সেখানে একজনের আপত্তি গ্রহণযোগ্য নয়। তারা আশা করবেন সভাপতি বিষয়টি পাস করবেন। প্রধানমন্ত্রীকে আজীবন সদস্যপদ দেয়ার বিষয়ে ডাকসুর সভাপতি ও ভিসি ড. আখতারুজ্জামান বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতাস্বরূপ এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই প্রাক্তন শিক্ষার্থী। আজ প্রায় তিন দশক পর ডাকসু নির্বাচনের বিষয়ে তিনি যে উৎসাহ দিয়েছেন, সদা সহযোগিতা করেছেন, যে আশ্বাস তিনি আমাদের দিয়েছিলেন তার সবই তিনি বাস্তবায়ন করেছেন। যার ফলে আমরা আত্মপ্রত্যয়ী হয়েছিলাম। তিনি পাশে থাকায় এই নির্বাচন আয়োজনে নিজেদের অত্যন্ত শক্তিশালী অনুভব করেছি। তার কারণেই মূলত আজকের এই কার্যকরী পরিষদ পুনর্জীবিত হলো। এ কারণেই আমাদের কার্যকরী পরিষদের অধিকাংশই সহমত জ্ঞাপন করেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ডাকসুর আজীবন সদস্য পদ প্রদানের বিষয়টি প্রস্তাবনায় এসেছে। তাকে আজীবন সদস্য পদ প্রদান করা হবে। সংসদীয় আইনের ভাষায় বোধহয় এভাবেই আছে সদস্য পদের নামটি, সেটা দেখেই করা হবে। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, এই প্রস্তাব গ্রহণ করা হলো। এটি আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে এজেন্ডা দিয়ে পরবর্তী সভায় গঠনতন্ত্র দেখে এই মহৎ উদ্যোগটি গ্রহণ করব। এটি আজকের সিদ্ধান্ত।’ সভাতে নব নির্বাচিত ছাত্র সংসদের একটি অভিষেক অনুষ্ঠান করারও সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তবে সেটি করতে দেড় থেকে দুই মাস সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন উপাচার্য। এবং সেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদকে আমন্ত্রণের কথাও বলা হয়। তবে ছাত্রলীগের প্যানেল থেকে নির্বাচিতরা এতে সমার্থন দিলেও ভিপি নুরুল এবং সমাজসেবা সম্পাদক এ সময় নীরব থাকেন। ভিপি নুরুল হক নুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসগুলোতে গণরুম থেকে জোর করে কাউকে প্রোগ্রামে নিয়ে যাওয়া, গেস্টরুম বন্ধ করা এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় সিট না দেয়ার এক প্রস্তাবও উঠান। তবে সে সময় ছাত্রলীগ প্যানেলের অধিকাংশ সদস্য চুপ থাকেন। এবং তাদের বক্তব্যের সময়ও এ বিষয়ে তারা কোনো কথা বলেননি। ভিপি নুর এ জন্য অবশ্য ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে দখলদারিত্ব বজায় রাখা এবং জোর-জবস্তির রাজনীতি করার অভিযোগ তোলেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে রিকশা ও সাইকেলের জন্য বিশেষ রুট চালু, ভাড়া নির্ধারণ এবং রিকশাচালকদের নির্দিষ্ট পোশাক দেয়ার একটি প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে পাস হয়। বলা ১১টায় ডাকসু ভবনের দ্বিতীয় তলায় ডাকসুর কার্যকরী সভা শুরু ডাকসুর সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামানের অনুমতি নিয়ে স্বাগত বক্তব্য রাখেন ডাকসুর জিএস গোলাম রব্বানী। এরপর মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এরপর রাব্বানী কেন্দ্রীয় সংসদের সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। এ সময় জিএস সভাপতির কাছে আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব গ্রহণের অনুমতি নেন। এক বছরের জন্য অনুমতি দেন উপাচার্য ড. আখতারুজ্জামান। ভেতরে যখন এ সব আনুষ্ঠানিকতা এবং প্রস্তাব গ্রহণ-বর্জন চলছে তখন বাইরে ১১ মার্চের ডাকসু নির্বাচনকে প্রহসন দাবি করে তার বিরুদ্ধে নানাবিধ কর্মসূচি পালন করেন বিরোধীরা। বেলা সাড়ে ১১টায় বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের নেত্রী এবং ডাকসু নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক (জিএস) প্রার্থী উম্মে হাবীবা বেনজিরের নেতৃত্বে মানববন্ধন শুরু করেন কিছু শিক্ষার্থী। তাদের হাতে থাকা ব্যানারে ১১ মার্চের নির্বাচন বাতিল চেয়ে বিভিন্ন বিষয় লেখা ছিল। বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের দিক থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে ডাকসু ভবন প্রদক্ষিণ করেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (বিসিএল)। তারা এ সময় প্রশাসনের সমালোচনা মূলক সেস্নাগান দিতে থাকেন। ১১টা ৪৫ মিনিটে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের পক্ষ থেকে বুকে কালো ব্যাজ ধারণ করে এবং মুখে কালো কাপড় বেঁধে মধুর ক্যান্টিন থেকে নীরব পদযাত্রা শুরু করেন। পরে ছাত্রদলের নেতারা জানান, ডাকসু নির্বাচনে শিক্ষকদের দলবাজি এবং ভোট কারচুপিতে যুক্ত হওয়ায় তারা বাকরুদ্ধ। তাই তারা মুখে ও বুকে কালো কাপড় বেঁধে নীরব পদযাত্রা করছেন। দুপুর ১২টার দিকে ছাত্র ইউনিয়নসহ ৫টি বামপন্থি ছাত্র সংগঠনের জোট প্রগতিশীল ছাত্রঐক্যের পক্ষ থেকে এক বিক্ষোভের সময় লাল কার্ড উঁচুতে তুলে ধরতে দেখা যায়। পরে তারা বলেন, উপাচার্য এবং ভোট কারচুপির সঙ্গে শিক্ষক এবং প্রশাসনের যুক্ত হওয়ায় তারা সংশ্লিষ্ট সবাইকে ছাত্রদের পক্ষ থেকে লাল কার্ড প্রদর্শন করেছেন। উপাচার্য আক্তারুজ্জামানের কাছে বিরোধীদের এ সব আন্দোলন ও দাবির বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘এটি একটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান। এখানে সবারই ভিন্নমত প্রকাশ ও প্রদর্শনকে সম্মানের সঙ্গে দেখা হয়। আমি আমার সব শিক্ষার্থীকে বলব তারা যেন গণতান্ত্রিক রীতিনীতি এবং মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকে।’ প্রসঙ্গত, ডাকসুর নির্বাচিত ২৫ সদস্যের মধ্যে ২৩ জনই ছাত্রলীগের প্যানেলের। অন্যদিকে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের প্যানেল সাধারণ ছাত্র অধিকার পরিষদের দু’জন সদস্য রয়েছেন। নুরুল এই প্যানেল থেকে নির্বাচিত। গত ১১ মার্চ প্রায় ২৯ বছর পর ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে ৪৩ হাজার ২৫৬ ভোটার ছিলেন। মোট ভোটারের মধ্যে ছাত্র ২৬ হাজার ৯৪৪ এবং ছাত্রী ১৬ হাজার ৩১২ জন ছিলেন।

আপনার মুল্যবান মতামত দিন......

comments

webnewsdesign.com

প্রধান কার্যালয়: শিমুল লজ, ১২/চ/এ/২/৪ (২য় তলা), রোড নং ৪, শেরেবাংলা নগর,শ্যামলী,ঢাকা‌.
বার্তা বিভাগ-01763234375 অথবা 01673974507, ইমেইল- sangbadgallery7@gmail.com

আঞ্চলিক কার্যালয়: বঙ্গবন্ধু সড়ক, আধুনিক সদর হাসপাতাল সংলগ্ন, বাসস্ট্যান্ড, ঠাকুরগাঁও-৫১০০

2012-2016 কপি রাইট আইন অনুযায়ী সংবাদ-গ্যালারি.কম এর কোন সংবাদ ছবি ভিডিও কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া অন্য কোথায় প্রকাশ করা আইনত অপরাধ

Development by: webnewsdesign.com