বাংলা নববর্ষের ইতিবৃত্ত ও প্রেক্ষাপটে ১৪২৭-মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ্ প্রিন্স…

মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২০ | ১০:১৬ অপরাহ্ণ |

বাংলা নববর্ষের ইতিবৃত্ত ও প্রেক্ষাপটে ১৪২৭-মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ্ প্রিন্স…
মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ্ প্রিন্স.

বিশেষ প্রতিবেদকঃ

বাংলা নববর্ষ বাংলাদেশী তথা বাঙালী সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলাদেশের প্রতিটি শহরে -নগরে-বন্দরে,গ্রামে -গঞ্জে বাংলা নববর্ষ আনন্দ উল্লাসে উদযাপিত হয়। জাতি,ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সব বাঙালির প্রাণের উৎসব এবং প্রধান অসাম্প্রদায়িক উৎসব।


যিশুখ্রিষ্টের জন্মের ৫৭ বছর আগে ভারত বর্ষের সম্রাট বিক্রমাদিত্য প্রবর্তন করেন বিক্রম সাম্বাত পঞ্জিকা।এ পঞ্জিকাই আমাদের বাংলা পঞ্জিকা। রাজা শশাঙ্কের আমলে ৫৯৩ খৃষ্টাব্দে বাংলা সাল গণনা শুরু হয়।যখন বিক্রম সাম্বাত ক্যালেন্ডারের সূচনা হয়,তখন লিখিত ফর্মে বাংলা ভাষা ছিলোনা, ছিলো সংস্কৃত ভাষা। ঠিক যে সময় বাংলা ভাষার লিখিত ফর্ম তৈরি হয়,তখনই বাংলা ক্যালেন্ডারের যাত্রা শুরু হয়।

বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদেশ যেমন বার্মা,থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, লাউস,ভুটান,শ্রীলঙ্কা প্রভৃতি দেশ একই ক্যালেন্ডার অনুযায়ী এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে বৈশাখ মাসের ০১ তারিখে বাংলা নববর্ষ পালন করে। ০১লা বৈশাখ তাই শুধু বাঙালির নববর্ষ নয় বরং এটি পুরো দক্ষিণ ও দক্ষিণ -পূর্ব এশিয়ার নববর্ষ। বাংলাদেশের সব আদিবাসী ও নৃগোষ্ঠী এ পঞ্জিকা অনুসরণ করে এবং এটি তাদেরও নববর্ষ।

পাল থেকে সেন,সেন থেকে নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে মুসলিম মুঘল সম্রাটের হাতে চলে যায় ভারত বর্ষের ক্ষমতা। মুঘলরা ক্ষমতায় এসে ইসলামিক বা আরবী ক্যালেন্ডার হিজরি অনুযায়ী রাজ্য পরিচালনা করতে শুরু করে।

মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহির উদ্দিন মুহম্মদ বাবর এবং তার ছেলে দ্বিতীয় মুঘল সম্রাট নাসিরুদ্দিন মুহম্মদ হুমায়ূন হিজরি সন অনুযায়ী রাজ্য পরিচালনা করলেও তৃতীয় মুঘল সম্রাট জালালুদ্দিন মুহম্মদ আকবর চান্দ্র মাসিক ক্যালেন্ডার পাল্টে বাংলা ক্যালেন্ডার পুনঃস্থাপন করে।হিজরি পঞ্জিকা চান্দ্র মাস ভিত্তিক হওয়ায় ৩৫৪/৩৫৫ দিনে বছর হয়,যা সৌর বছরের ৩৬৫/৩৬৬ দিনে বছরের চেয়ে ১০/১১ দিন ছোট বা কম।ফলে হিজরি পঞ্জিকা অনুযায়ী একই মাস ঘুরে ঘুরে কয়েক বছর পরে ভিন্ন ঋতুতে আসে।

এতে কৃষককে খাজনা দিতে অসুবিধায় পড়তে হয়,কারণ কৃষক ফসল বিক্রি করে খাজনা দেন।চান্দ্র মাসের বছর একেক সময় একেক ঋতুতে শেষ হয় বলে তখন ফসল তোলার কাল ঠিক থাকে না। এ অসুবিধা দূর করার জন্য বিচক্ষণ সম্রাট আকবর ইরান থেকে আসা জ্যেতির্বিজ্ঞানী আমির ফতুল্লাহ শিরাজীকে দায়িত্ব দেন।তিনি যেন হিজরি চান্দ্র বর্ষ পঞ্জিকে সৌর বর্ষ পঞ্জিতে রূপান্তরিত করে দেন।এভাবেই সৌর বর্ষ পঞ্জি বাংলা পঞ্জিকার নবযাত্রা শুরু হয়।

অধিবর্ষ সংক্রান্ত একটি জটিলতা ছিল মূল পঞ্জিকায়,ফলে ইংরেজি তারিখের সাথে বাংলা তারিখের মিল রাখা যেতোনা। যেমন এ বছর ৮ ফাগুন ২১ ফেব্রুয়ারী হলো তা অন্য বছর ৯ ফাগুন ২১ ফেব্রুয়ারী হচ্ছে, এ সমস্যা দূর করতে ভাষাবিদ ড.মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ’র নেতৃত্বে একটি কমিটি ফাগুন মাসকে অধিবর্ষ মাস ঘোষণা করে,ফলে এখন মাস গণনা করা হয় বৈশাখ থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত ৫ মাস ৩১ দিনে,আশ্বিন থেকে চৈত্র ৭ মাস ৩০ দিনে এবং প্রতি ৪ বছর পর পর ফাগুন হবে ৩১ দিনে।বাংলাদেশ গ্রাম প্রধান দেশ,এদেশের সহজ-সরল পল্লীবাসী আবহমান কাল ধরে বছরের শেষ দিনকে চৈত্রসংক্রান্তি হিসেবে পালন করে আসছে, এদিনে গ্রামে গ্রামে, শহর বন্দর নগরে বিভিন্ন মেলা হয়।নাগরদোলা বসে, পুতুল নাচ হয়,যাত্রাপালা হয়,অর্থাৎ উৎসব মুখরিত পরিবেশের মধ্য দিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর বিপুল হরেক রকমের আয়োজনে মেতে ওঠে সারাদেশের মানুষ।

যেহেতু এটি বাংলা নববর্ষ তাই বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্য দিয়ে রাঙানো হয় এ উৎসব। খাজনা দিয়ে যেমন বছরের শেষ দিনে সরকারের কাছথেকে দায়মুক্ত হয় মানুষ তেমনি যাবতীয় বকেয়া পরিশোধ করে ব্যবসায়ী বা দোকানির কাছ থেকেও দায়মুক্তির দিন এটি।প্রতিটি ব্যবসায়ী এ দিনে হালখাতা খুলে বসেন। অর্থাৎ তারা বকেয়া হিসেবের খাতা হালনাগাদ করে নেন।একে একে দেনাদাররা আসেন,দেনা পরিশোধ করেন, দোকানিরা পুরনো হিসেব চুকিয়ে তাদের মিষ্টি মুখ করিয়ে কোলাকুলি করেন।এভাবে একটি আনন্দঘন ও উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্য দিয়ে অতীতের সব দায় দেনার অবসান ঘটিয়ে নতুন বছরের যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশের মানুষ।তাই ১লা বৈশাখ বাঙালি সংস্কৃতির প্রাণের স্পন্দন।

বৈশ্বিক চলমান করোনা ভাইরাস সংকটে বাংলাদেশও আজ চরম উৎকন্ঠা ও শংকার মধ্যে রয়েছে।ইতোমধ্যে এ রোগের বিশ্ব মৃত্যু মিছিলে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের প্রায় ৫০টি লাস,করোনায় সনাক্ত রোগীর সংখ্যা অদ্যবদি হাজার ছাড়িয়েছে।এমন বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে বাংলা নববর্ষের ইতিহাসে এ প্রথম কোনপ্রকার আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া পালিত হলো বাংলা নববর্ষ-১৪২৭।

ঐতিহাসিক রমনার বটমূলে দেখা মেলেনি ছায়ানটের পরিবেশনায় মনমাতানো সুরের মূর্চ্ছনার সেই সংগীতের আসর,চারুকলার বকুল তলায় বাঙালি সংস্কৃতির বৈচিত্র্য গাঁথা মঙ্গল শোভাযাত্রার আলোর মিছিল নিভে গেল কোন এক অদৃশ্য করাল থাবায়,পান্তা-ইলিশ আর রকমারি বর্তার হাট জমেনি একেবারেই?চারিদিকে শুনশান নিরবতায় করোনায় আতঙ্কিত বাঙালি তবুও হৃদয় গহীনে স্থান দিয়েছে শতবর্ষী বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্যে লালিত ১লা বৈশাখকে।শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে চলমান মহামারির অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা জেনেও যার যার গৃহে অবস্থান নিয়ে পরিবার -পরিজনকে নিয়ে ১লা বৈশাখ -১৪২৭ উদযাপনে এতোটুকু কার্পণ্য করেননি,সাধ্যমত ঘরোয়াভাবে বৈশাখ বরণ করে নিয়েছে। মুসলিম চেতনায় শিরোধার্য মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা ও এ মহামারী থেকে স্বীয় স্বদেশ তথা পুরো বিশ্বকে শান্তি ফিরিয়ে দিতে বছরের শুরুর দিনে অনেকেই কায়মানোবাক্যে প্রভুর কাছে প্রার্থনা জানান।ঐতিহ্যের বাংলা নববর্ষ ফিরে আসুক তার আপন মহিমায়, সেদিনের অপেক্ষায় থাকি।

লেখক : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ লোকসংস্কৃতি ফোরাম,বাংলাদেশ ফেডারেল সাংস্কৃতিক পরিষদ -বাফেসাপ, পদ্মকুঁড়ি কালচারাল ফাউন্ডেশন, স্বাধীনতা সংসদ, সাধারণ সম্পাদক : বাংলাদেশ যুব অর্থনীতিবিদ ফোরাম, অতিরিক্ত মহাসচিব, বাংলাদেশ শিক্ষক ইউনিয়ন -বিটিইউ,সম্পাদক ও প্রকাশক, বিজনেস ডাইজেস্ট, সম্পাদক মণ্ডলীর সভাপতি, দৈনিক অন্যায়ের চিত্র।

আপনার মুল্যবান মতামত দিন......

comments



স্তন ক্যান্সারের কারন,প্রতিকার ও প্রতিরোধ-আয়েশা সিদ্দিকা শেলী

প্রধান কার্যালয়: শিমুল লজ, ১২/চ/এ/২/৪ (২য় তলা), রোড নং ৪, শেরেবাংলা নগর,শ্যামলী,ঢাকা‌.
বার্তা বিভাগ-01763234375 অথবা 01673974507, ইমেইল- sangbadgallery7@gmail.com

আঞ্চলিক কার্যালয়: বঙ্গবন্ধু সড়ক, আধুনিক সদর হাসপাতাল সংলগ্ন, বাসস্ট্যান্ড, ঠাকুরগাঁও-৫১০০

2012-2016 কপি রাইট আইন অনুযায়ী সংবাদ-গ্যালারি.কম এর কোন সংবাদ ছবি ভিডিও কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া অন্য কোথায় প্রকাশ করা আইনত অপরাধ

Development by: webnewsdesign.com