একদিকে সংলাপ, অন্যদিকে হুশিয়ারি

সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সংলাপ হচ্ছে, জাতীয় রাজনীতিতে এটা সুখবর

বৃহস্পতিবার, ০১ নভেম্বর ২০১৮ | ৯:১৮ পূর্বাহ্ণ |

সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সংলাপ হচ্ছে, জাতীয় রাজনীতিতে এটা সুখবর
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রধান দাবিই হলো, 'সংসদ ভেঙে দিয়ে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন।

অনলাইন ডেস্কঃ আসন্ন একাদশ  সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সংলাপ হচ্ছে, জাতীয় রাজনীতিতে এটা সুখবর। যদিও  রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন পর্যন্ত কোনো সংলাপ থেকে উল্লেখযোগ্য সমাধান আসেনি।  কোনো সংলাপই রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেনি। তবুও সংকট উত্তোরনে সংলাপের চেয়ে কার্যকর আর কিছু হতে পারে না।  ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে বিরোধী দলীয় জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সংলাপ ঘিরে মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে প্রত্যাশা।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের সঙ্গে সংলাপে বসছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। এদিন সন্ধ্যায় ড. কামাল হোসেন, মির্জা ফখরুলসহ ১৬ সদস্যের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে গণভবনে সংলাপে বসবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৪ দলীয় জোটের ২২ নেতা।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে আলোচনার জন্য পাঠানো ড. কামাল হোসেনের চিঠিতে তাৎক্ষণিক সাড়া দিয়ে আওয়ামী লীগ এবং প্রধানমন্ত্রীর দ্রুততার সঙ্গে এই সংলাপ আয়োজনকে ইতিবাচকভাবেই নিয়েছে সবমহল। গণভবনের এই সংলাপ নিয়ে দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে আগ্রহ, চলছে নানা জল্পনা।  আবার কয়েকটি বিষয়ে  উভয় পক্ষের অনড় ও অনমনীয় অবস্থানের কারণে সংলাপ কতোটা ফলপ্রসু হয়, এই নিয়ে মানুষের মধ্যে সংশয় ও শংকা আছে। কারণ ঐক্যফ্রন্ট নেতা ড, কামাল হোসেনকে সংলাপের আমন্ত্রণ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সংবিধান সম্মত সকল বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। অনেকেরেই প্রশ্ন, এর মানে কি এই যে প্রধানমন্ত্রী সংলাপে রাজি হলেও ‘বর্তমান সংবিধানে যা আছে সেভাবেই নির্বাচনের’ অবস্থান থেকে নড়ছেন না?

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রধান দাবিই হলো, ‘সংসদ ভেঙে দিয়ে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন। কিন্তু এটা করতে হলে সংবিধানে পরিবর্তন আনতে হবে। কিন্তু সরকারি দল সংবিধানের বাইরে যেতে আগ্রহী নয়। এক্ষেত্রে প্রশ্ন ওঠেছে, বিরোধীদের দাবি মেনে কতটুকু ছাড় দেবেন প্রধানমন্ত্রী! উপেক্ষিত হলে বিরোধীদের সামনেই বা বিকল্প কি।

সংলাপ শুরু হওয়ার আগেই এর উদ্দেশ্য ও ফল নিয়ে নানা মহলে সরগরম আলোচনা চলছে। কেউ বলছেন, সংলাপটি লোক দেখানো। সরকার নিজের ছক মতোই নির্বাচন করবে। কারও মতে, সরকার দেশের মানুষ ও বহির্বিশ্বকে দেখাতে চাইছে যে তাঁরা সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক একটি নির্বাচনে আগ্রহী। পরপর দুবার নির্বাচনে আসা না আসা বিএনপির বিষয়। এ ছাড়া আরও একটি মত রয়েছে, বর্তমান অবস্থা ও ব্যবস্থায় নির্বাচন হলে ‘নেতৃত্বহীন’ বিএনপি খুব বেশি সুবিধা করতে পারবে না, শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগই জয়ী হবে। কেননা বিএনপির প্রধান খালেদা জিয়া দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হয়ে জেলে, বিকল্প নেতা তারেক রহমান বিদেশে। পরের পর্যায়ের বেশ কয়েকজন নেতাও সম্প্রতি আটক হয়েছেন।

সরকারি দলের নেতারা বরাবর বলে আসছেন, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হবে। তবে এখন বলছেন বিরোধী দল তথা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সাত দফা নিয়েও আলোচনা হতে পারে। এখন দেখা যাক বিরোধী দলের সাত দফায় কী আছে। এতে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে সরকারের পদত্যাগ, জাতীয় সংসদ বাতিল, আলোচনা করে নিরপেক্ষ সরকার গঠনের কথা বলা হয়েছে।

জাতীয় সংসদ বাতিল না হলেও এখন আর এর কার্যকারিতা নেই, যদিও সাংসদেরা পদে বহাল থাকবেন। কিন্তু বর্তমান সরকার পদত্যাগ করে নিরপেক্ষ সরকার গঠন করার যে দাবি বিরোধী দল করছে, সেটি পূরণ করতে হলে সংবিধান পরিবর্তন করতে হবে। কে করবে সেই পরিবর্তন? ১৯৯৬ সালে গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে সেই পরিবর্তন আনা হয়েছিল। এখন সেরকম কোনো পরিস্থিতি আছে কি?

অনেকেই বলছেন, এই সংলাপ লোক দেখানো, কালক্ষেপনের জন্যই এই আয়োজন। অতীতে বহুবার আলোচনার নামে সময় ক্ষেপন করে শাসকদলকে নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য তৎপর হতে দেখা গেছে। দেশে তিন দশক ধরে মীমাংসা আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধানে যে সব চেষ্টা হয়েছে তাতে সাফল্যের নজির নেই বললেই চলে।তত্বাবধায়ক সরকারের ইস্যুতে সৃষ্ট সঙ্কট নিরসনে ১৯৯৪ সালে জাতিসংঘ মহাসচিব মধ্যস্থতার জন্য তার একজন দূত পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু তা সফল হয়নি। ২০০৪ সালে তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের মহাসচিব পর্যায়ের দীর্ঘ সংলাপেও কোনো লাভ হয়নি, যার জের ধরে ২০০৭ সালে সেনা-সমর্থিত একটি সরকার ক্ষমতা নিয়ে নেয়। এরপর ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি যাতে অংশ নেয়, তা নিশ্চিত করতে বিদেশীদের মধ্যস্থতায় মীমাংসার একাধিক চেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছিল।

দেশের মানুষ দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেও ২০১৪ সালে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিবের সহকারী ফার্নান্দেজ তারানকোর নেওয়া উদ্যোগের ফলে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত সংলাপের কথা ভুলে যায়নি।

এরই মধ্যে এবারের সংলাপ বসার আগেি সরকারের আন্তরিকতার ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর । তিনি  মন্তব্য করেছেন, আপিলে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাজা বৃদ্ধির ফলে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সংলাপ কতটুকু ফলপ্রসূ হবে, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।


মির্জা ফখরুলের এ মন্তব্য যে মোটেও ভিত্তিহীন নয়, তার প্রমাণ পাওয়া যায় সংলাপের একদিন আগে বুধবার রাজধানীয়র মতিঝিল টিএন্ডটি কলোনি মাঠের জনসভায় ১৪ দলীয় জোটের  নেতাদের বক্তব্যে। জনসভায় ক্ষমতাসীন জোটের নেতারা কঠোর ভাষায় জাতীয় ঐক্যফন্টকে অাক্রমণ করেছেন। প্রধান অতিথির বক্তব্যে জোটের মুখপাত্র ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম সরাসরিই বলেছেন, সংবিধানের বাইরে আলোচনা করে কোনো লাভ হবে না। ১৪ দল সংবিধানের বাইরে কিছু মেনে নেবে না। মেনে নেয়ার প্রশ্নই ওঠে না। 

ড. কামাল হোসেনের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আপনি একজন সম্মানীয় ব্যক্তি। বঙ্গবন্ধু আপনাকে কামাল হোসেন বানিয়েছেন। বিনা ভোটে এমপি বানিয়েছিলেন। কিন্তু আপনি বিএনপির খুনি চক্রের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন। লজ্জা হয়, দুঃখ হয় আপনার এই পতন দেখে। তারপরও বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা মহানুভবতা যে, আপনার চিঠির জবাবে সংলাপের জন্য গণভবনে আপনাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। আপনি আসুন। যে সংবিধান তৈরি করতে আপনি সহায়তা করেছেন সেই সংবিধানের বাইরে দয়া করে আপনি যাবেন না। ওদের কথায় মিথ্যাচার করবেন না। সংবিধানে যা আছে তাই  হবে।

বিএনপির নেতাদের হুশিয়ার করে দিয়ে ক্ষমতাসীন দলের এই শীর্ষনেতা বলেন, অনেক জ্বালাও-পোড়াও করেছেন আপনারা। ২১ আগস্টে শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে গিয়ে আইভি রহমানসহ ২৪ জন মানুষকে হত্যা করেছে। অনেক পাপ করেছেন। চুরি করেছেন, লুটপাট করেছেন। পাপের ফল এখন ভোগ করছেন বেগম জিয়া এবং দল। দেশের মানুষ আপনাদের প্রত্যাখান করেছে। সেই ভয়ে আপনারা নির্বাচন বানচাল করার চেষ্টা করছেন। আপনাদের আর ছাড় দেওয়া হবে না। আইনগতভাবে আপনাদের মোকাবেলা করা হবে। আমরা সেই পদক্ষেপ নিয়ে রেখেছি।

এরকমই এক কঠিন  রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সংশয় ও সন্দেহ সামনে রেখে বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল আলোচিত সংলাপ। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষে দলটির সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন এ সংলাপের নেতৃত্ব দেবেন।

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে এ সংলাপ দেশের রাজনীতির জন্য বেশ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল। তবে  দীর্ঘদিন ধরে সংলাপের আহ্বানে সাড়া না দিয়ে অনড় থাকা আওয়ামী লীগ হঠাৎ করে সংলাপে সম্মতির বিষয়টি আগামীর রাজনীতির জন্য ‘মাইলফলক’ বার্তা বয়ে আনতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

আপনার মুল্যবান মতামত দিন......

comments

প্রধান কার্যালয়: শিমুল লজ, ১২/চ/এ/২/৪ (২য় তলা), রোড নং ৪, শেরেবাংলা নগর,শ্যামলী,ঢাকা‌.
বার্তা বিভাগ-01763234375 অথবা 01673974507, ইমেইল- sangbadgallery7@gmail.com

আঞ্চলিক কার্যালয়: বঙ্গবন্ধু সড়ক, আধুনিক সদর হাসপাতাল সংলগ্ন, বাসস্ট্যান্ড, ঠাকুরগাঁও-৫১০০

2012-2016 কপি রাইট আইন অনুযায়ী সংবাদ-গ্যালারি.কম এর কোন সংবাদ ছবি ভিডিও কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া অন্য কোথায় প্রকাশ করা আইনত অপরাধ

Development by: webnewsdesign.com